সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের লাখাই শিয়ালমারা অংশের হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক রইছ মিয়া। একজন মাঝারি মানের কৃষক তিনি। চলতি বোরো মৌসুমে তিনি দেড় হাল বা ১৮ কিয়ার জমি আবাদ করেছিলেন। এপ্রিলের ২৬ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে তার ধান ক্ষেত।
মাত্র তিন কিয়ার জমির ধান কেটেছিলেন তিনি। এই ধানও বৃষ্টিতে পচে যাওয়ায় শুকাতে পারেননি। ফসল গোলায় তুলতে পারলে অন্তত দেড়শ মণ ধান পেতেন। মাঝারি কৃষক হিসেবে সরকারকেও ন্যায্য মূল্যে ধান দিতে পারতেন।
এখন আটজনের সংসারে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে রইছ মিয়ার। সারা বছর কীভাবে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করবেন, আগামীতে কীভাবে চাষ করবেন এই দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে তাকে। কারণ তার কৃষিতে খরচ হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা।
ধান ডুবে যাওয়ায় কাউকে দোষ না দিয়ে ভাগ্যকেই দুষছেন রইছ মিয়া। বলেন, “কপাল খারাপ। ফালগুন তনি বৃষ্টি। আওর আর কত পানি নিতো। আওর ভরাট হয়ে গেছে?”
কৃষি বিভাগ ও পাউবোর মতে, মার্চ ও এপ্রিলে গেল বারের চেয়ে এবার বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। যে কারণে হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেখার হাওর, গুরমার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, কানলার হাওর, ডাকুয়ার হাওর, পাগনার হাওর, হালির হাওরসহ বিভিন্ন হাওরের কিছু কাঁচা ধান ডুবে নষ্ট হয়ে যায়।
তখন শ্যালো মেশিন চালিয়ে পানি নিষ্কাশনেরও চেষ্টা করেন কৃষকরা। এরপর এপ্রিলের ২৫ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে হাওরের পাকা ধান জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলা ১৯৩টি হাওরে চলতি বোরো মৌসুমে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ লাখ টন ধান; যার বাজার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় ধান সংগ্রহ অভিযানও থমকে আছে। এর মধ্যে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ধান ৩৬ টাকা কেজি দরে কৃষকদের কাছ থেকে কিনবে সরকার। তবে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরুর পর গুদামগুলোতে কোনো ভিড় নেই। কাঙ্ক্ষিত ধান না পাওয়ায় এবং ধান পচে গুণাগুণ নষ্ট হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ কম।
খাদ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৯৫ দশমিক ৬০০ টন ধান সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে আট টন, শান্তিগঞ্জে দুই টন, দোয়ারায় ১৫ টন, ছাতকে তিন টন, জগন্নাথপুরে চার টন, দিরাইয়ে ১০ টন, শাল্লায় এক টন, ধর্মপাশায় ৩৬ টন, মধ্যনগরে তিন টন, জামালগঞ্জে ছয় টন, তাহিরপুরে ছয় টন এবং বিশ্বম্ভরপুরে এক টন সংগ্রহ হয়েছে।
সব চেয়ে কম সংগ্রহ হয়েছে হাওর উপজেলা শাল্লা ও বিশ্বম্ভরপুরে। দুটি উপজেলায় মাত্র এক টন করে সংগ্রহ করা হয়েছে।
শুধু ধানই নয় চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাতেও প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন মিল মালিকরা। তারা বলেছেন, কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে তারা চাল করে গুদামে দেন। এবার ধান নষ্ট হওয়ায় চালের উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে। জেলায় ১৪৪ টন আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো চাল সংগ্রহ হয়নি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের মুক্তিখলা গ্রামের কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, “আমার চার কেয়ারের মধ্যে সবটা কাটছি। তবে কাটার পর হাইব্রিড ধান রোদ না পেয়ে অঙ্কুর গজিয়েছে। যার ফলে ফলনে প্রভাব ফেলেছে। নষ্ট ধান গুদামে নিলে তারা রাখবে না। তাই গুদামে ধান দেবার চিন্তা বাদ দিয়া দিছি।”
বিষণ্ন মনে দিরাই উপজেলার উদগল হাওরের কল্যাণী গ্রামের কৃষক স্বপন রায় বলেন, “চাইর কিয়ারের দুই কিয়ার গেছে গা। স্ত্রী ও দুই মাইয়া নিয়া সংসার। মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোটটা সপ্তম শ্রেণিতে। নিজে ও স্ত্রী অসুস্থ থাকায় সব কাজ করতে হয়েছে শ্রমিক দিয়া।
“কেয়ার প্রতি জমিভাড়াসহ খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা করে। এখন অর্ধেক জমি তলিয়ে গিয়ে ও বাকি জমির কাটা ধান ভিজে নষ্ট হওয়ায় বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছি।”
সারা বছরের খোরাকি সংগ্রহ করা যেখানে কঠিন হয়ে গেছে, সেখানে সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছেন না স্বপন রায়।
তার মতো একই গ্রামের নিকুঞ্জ দাস, অনিল দাস, সমর দাস, নিরাপদ দাসসহ বেশিরভাগ কৃষকের এবার সরকারি গুদামে ধান দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, হাওরে এবার অর্ধেকের বেশি ধান তলিয়ে গেছে। সেইসঙ্গে অবশিষ্ট কাটা ধানের একটা অংশ বৃষ্টির কারণে, রোদের অভাবে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে বড়ো রকমের ক্ষতি হয়েছে কৃষকের।
তাই চলতি বছর সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না বলে ধারণা করছেন তিনি।
সুনামগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ২০২৫ সালে জেলায় ১৫ হাজার ৩৫৫ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল। এবার ক্ষয়ক্ষতির কারণে লক্ষ্যমাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে।
“বৃষ্টির কারণে ও রোদের অভাবে ধানে আদ্রতা বেশি। তাই আমরা কৃষকদের ধান শুকানোর পরামর্শ দিচ্ছি”, বলে যোগ করেন তিনি।
বিডি নিউজ ২৪
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: