যেভাবে ইসরায়েলের জন্ম হয়েছিল ফিলিস্তিনে

সময় ট্রিবিউন | ১৭ মে ২০২১, ০৬:০৭

ছবি: ইন্টারনেট

ফিলিস্তিনের গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকা। এখানে ১৯৩০-এর দশকে পোল্যান্ড থেকে আসা ইহুদীরা কৃষি খামার গড়ে তুলেছিল। ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনি আরবদের বসবাস।সেখানে আরবদের কৃষি খামার ছিল। তারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছিল।

সে সময় মুসলিম এবং ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ক মোটামুটি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারলো যে তারা ধীরে ধীরে জমি হারাচ্ছে। ইহুদিরা দলে-দলে সেখানে আসে এবং জমি ক্রয় করতে থাকে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় সাত লাখের মতো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। তারা ভেবেছিল দ্রুত সমস্যার সমাধান হলে তারা বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু ইসরায়েল তাদের আর কখনোই বাড়িতে ফিরতে দেয়নি।

ইসরায়েলের সাবেক প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বছর দশেক আগে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ফিলিস্তিনিদের কেন এই দশা হলো, সেজন্য তাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ জমি ফিলিস্তিনিদের হাতেই থাকতো। তাদের একটি আলাদা রাষ্ট্র হতো। কিন্তু তারা সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৪৭ সালে তারা ভুল করেছে। আমরা কোনও ভুল করিনি। তাদের ভুলের জন্য আমরা কেন ক্ষমা চাইবো?’

১৮৯৭ সাল থেকেই ইহুদিরা চেয়েছিলেন নিজেদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। ১৯১৭ সালে থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে ব্রিটেন।

তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য সহায়তা করবে। ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদি আন্দোলনের নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে। সে চিঠি ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ নামে পরিচিত।

ইহুদিদের কাছে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের জমিতে তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ করে দিবে। যদিও রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সে জায়গায় বসবাস করতো। ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সেটি তাদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের ভাবনাকে আরো তরান্বিত করেছে।

১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানির শাসক হিটলার ইহুদিদের প্রতি কঠোর হতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে জাহাজে করে হাজার হাজার ইহুদি অভিবাসী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আসতে থাকে। তখন ফিলিস্তিনি আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ফিলিস্তিনি আরবরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্রোহ করে। কিন্তু আরবদের সে বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে ব্রিটিশ সৈন্যরা।

ফিলিস্তিনিদের উপর ব্রিটিশ সৈন্যরা এতো কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল যে আরব সমাজে ভাঙন তৈরি হয়েছিল। ইহুদিরা তাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে বদ্ধপরিকর ছিল। ব্রিটেনের সহায়তায় সে অনুযায়ী তারা কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল।

১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে ব্রিটেন চেয়েছিল হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান জোরালো করতে। সেজন্য আরব এবং ইহুদি- দু’পক্ষকেই হাতে রাখতে চেয়েছে ব্রিটেন।

১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি ব্রিটেনের সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয় পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পঁচাত্তর হাজার ইহুদি অভিবাসী আসবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে। অর্থাৎ সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছিল। ব্রিটেনের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয়নি ইহুদিরা। তারা একইসাথে ব্রিটেন ও হিটলারের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা করে।

তখন ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সেখান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ইহুদি সৈন্যরা ব্রিটেন এবং আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের বাহিনীর দ্বারা লাখ লাখ ইহুদি হত্যাকাণ্ডের পর নতুন আরেক বাস্তবতা তৈরি হয়।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর যেসব ইহুদি বেঁচে ছিলেন তাদের জন্য কী করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা আরো জোরালো হয়।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। ট্রুম্যান চেয়েছিলেন হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতি দ্রুত ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে জায়গা দেয়া হোক।

কিন্তু ব্রিটেন বুঝতে পারছিল যে এতো বিপুল সংখ্যক ইহুদিদের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ে গেলে সেখানে গৃহযুদ্ধ হবে। এ সময় ইহুদিদের সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ সৈন্যদের উপর ফিলিস্তিনের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো শুরু করে।

তখন ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে জাহাজে বোঝাই হয়ে আসা হাজার হাজার ইহুদিদের বাধা দেয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ইহুদি সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্রিটেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সমাধানের জন্য ব্রিটেনের উপর চাপ বাড়তে থাকে।

এরপর বাধ্য হয়ে ব্রিটেন বিষয়টিকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য। ইহুদিরা মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেয়া হয় মোট জমির অর্ধেক। কিন্তু আরবদের জনসংখ্যা ছিলো জমির মালিকানার দ্বিগুণ।

স্বভাবতই আরবরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে তখন ইহুদিরা বিজয় উল্লাস শুরু করে। অবশেষে ইহুদিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেল। কিন্তু আরবরা অনুধাবন করেছিল যে কূটনীতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তের পর আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


  1. ৭ নভেম্বর পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা : বিজিএমইএ
    ৭ নভেম্বর পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা : বিজিএমইএ
  1. বাংলাদেশ আজ কোন পথে : মব সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক ধস এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের অপরিহার্যতা
    বাংলাদেশ আজ কোন পথে : মব সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক ধস এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের অপরিহার্যতা
  1. যুদ্ধের প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ : বিশ্বব্যাংক
    যুদ্ধের প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ : বিশ্বব্যাংক
  1. ছয় মাসের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ
    ছয় মাসের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ
  1. ঢাকা থেকে সৌদিগামী ১০০ ফ্লাইট বাতিল : ভোগান্তিতে প্রায় ১৬ হাজার যাত্রী
    ঢাকা থেকে সৌদিগামী ১০০ ফ্লাইট বাতিল : ভোগান্তিতে প্রায় ১৬ হাজার যাত্রী
  1. দেশ ধ্বংসের কারিগর জুলাই আন্দোলন : শিল্পীদের ভূমিকা ও তালিকা
    দেশ ধ্বংসের কারিগর জুলাই আন্দোলন : শিল্পীদের ভূমিকা ও তালিকা
  1. ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ নেই : গভর্নর
    ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ নেই : গভর্নর
  1. নেত্রী মুক্তি পাক, সেদিন ফুল নেব
    নেত্রী মুক্তি পাক, সেদিন ফুল নেব
  1. ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ, বাড়বে ব্যয়
    ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ, বাড়বে ব্যয়
  1. সুনামগঞ্জে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার শঙ্কা
    সুনামগঞ্জে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার শঙ্কা