বাংলাদেশ আজ তার ইতিহাসের অন্যতম করুণ ও ভয়াবহ সময় পার করছে। ১৯৭১ সালে তিরিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশ আজ এক গভীর অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ সরকার এবং নেপথ্যে বিএনপি-জামায়াত চক্রের যোগসাজশে গত দেড় দশকের গৌরবময় অর্জন ও সার্বভৌমত্বকে আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অরাজকতা থেকে ১৬ কোটি মানুষকে মুক্ত করে দেশকে পুনর্গঠন করতে হলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও প্রত্যাবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
উন্নয়নের সোনালী অধ্যায় : শেখ হাসিনার শাসনামল
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও গতিশীল গণতান্ত্রিক উন্নয়নের যুগ। এই সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং শত শত ফ্লাইওভার ও মহাসড়ক নির্মাণের মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছিল। কৃষি খাতে ভর্তুকি এবং ডিজিটালাইজেশনের কারণে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' থেকে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ আর 'তলাবিহীন ঝুড়ি' নয়, বরং একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল।
বর্তমান সংকট : মব সন্ত্রাস ও চরম আইনশৃঙ্খলাহীনতা
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, একটি অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক শক্তির প্রভাবে আজ দেশের সেই অগ্রযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। বর্তমান শাসনামলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বলতে কিচ্ছু নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ও ভেঙে ফেলে দেশের অলিগলিতে আজ উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব শাসন কায়েম করেছে। বিচার ব্যবস্থার কোনো তোয়াক্কা না করে রাস্তায় মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত 'মব জাস্টিস' বা মব সন্ত্রাস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়; দিনদুপুরে ডাকাতি, ছিনতাই, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের জানমালের ওপর তাণ্ডব চলছে। সুশাসন ও আইনের শাসনের জায়গায় আজ স্থান করে নিয়েছে এক নৈরাজ্যিক জঙ্গল রাজত্ব।
অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব : লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও লুটপাট
যে অর্থনীতি একসময় বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
· জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম: চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য আজ আকাশচুম্বী। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
· লুটপাট ও ব্যাংক খাত ধ্বংস: শেখ হাসিনার আমলে গড়ে ওঠা রিজার্ভ এবং শক্তিশালী আর্থিক খাত আজ লুটেরাদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করে দেশের কোটি কোটি টাকা পাচার করা হচ্ছে।
· উৎপাদনে স্থবিরতা: পোশাক খাতসহ প্রধান শিল্প কারখানাগুলোতে আগুন ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে উৎপাদন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্জনগুলো ধ্বংসের চক্রান্ত
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের যে অবকাঠামোগত বিপ্লব ঘটেছিল, তা আজ ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা চলছে। ইউনুস ও তারেক জিয়া চক্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চলছে। ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি উগ্রপন্থী ও অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে।
আওয়ামী নেতাকর্মীদের ওপর নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ, মামলা ও নিপীড়ন
রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর ওপর চালানো নজিরবিহীন নিপীড়নে।
· দেশের কোণায় কোণায় ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মী, আওয়ামী লীগের সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাধারণ মানুষের ওপর বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ড চালানো হয়েছে।
· বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে হাজার হাজার মিথ্যা, বানোয়াট ও গায়েবি মামলা দেওয়া হচ্ছে।
· কারাগারে ও প্রকাশ্যে পিটিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ; সরকারের বিরুদ্ধে বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি কথা বললেই নেমে আসছে শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানি।
কেন দেশকে বাঁচাতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই একমাত্র পথ?
ইতিহাস প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যখনই কোনো মহাসংকটে পড়েছে, তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র কান্ডারি।
· অর্থনীতি সচল করতে: লুটেরাদের হাত থেকে ব্যাংকিং খাত ও বাজারব্যবস্থাকে রক্ষা করে সাধারণ মানুষের পেটে ভাত দেওয়ার শক্তি একমাত্র তাঁর রয়েছে।
· মব সন্ত্রাস বন্ধে: কঠোর হস্তে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ট্র্যাক রেকর্ড কেবল শেখ হাসিনারই আছে।
· সার্বভৌমত্ব রক্ষায়: কোনো বিদেশি প্রভুর কাছে মাথা নত না করে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সময় এসেছে সকল প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে একত্রিত হওয়ার। দেশের স্বার্থে, জনগণের অধিকার আদায়ের স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য আজ জননেত্রী শেখ হাসিনার নিরাপদ ও সসম্মানে প্রত্যাবর্তনই দেশের মানুষের একমাত্র আশা ও ভরসা।
লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: