বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০২:০৮ অপরাহ্ন

একই স্থানে একই অনাচারের পুনরাবৃত্তি,ব্যবধান ১২ বছর

একই স্থানে একই অনাচারের পুনরাবৃত্তি,ব্যবধান ১২ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক

একযুগ আগে আর পরে, সেই একই অনাচারের পুনরাবৃত্তি। দুটি ঘটনা একই রকম, ঘটনাস্থলও সেই কুষ্টিয়াই। ২০০৬ সালের ২৯ মে যে জিঘাংসার শিকার হয়েছিলেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী, ১২ বছর পর ২০১৮ সালের ২২ জুলাই একই জিঘাংসার শিকার হলেন মাহমুদুর রহমান । এক যুগ আগে আর পরে হলেও হামলার ঘটনা দুটোর মধ্যে যোগসাযুয্য আছে।

রোববার (২২ জুলাই ) কুষ্টিয়ায় একটি মানহানি মামলায় জামিন নিতে যান বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এবং আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিককে নিয়ে কটূক্তি করে বক্তব্যে দেওয়ায় আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত ওরফে তুষারের দায়ের করা মানহানি মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলায় জামিন পেলেও আদালত চত্বরে তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে আদালত চত্বর থেকে বের হতে চাইলে তার ওপর হামলা করে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা। হামলায় তাঁর মাথা ও মুখ জখম হয়েছে। এ ছাড়া তাঁকে বহনকারী গাড়িটি ভেঙে দেয় হামলাকারীরা। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আদালত চত্বর ছেড়ে চলে যান মাহমুদুর রহমান। হামলার জন্য তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে দায়ী করলেও পুলিশ হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি।

এক যুগ আগে ২০০৬ সালের ২০০৬ কুষ্টিয়াতে সাংবাদিক নেতা ও আজকের প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ওপর বিএনপি ও যুবদল-ছাত্রদলের ক্যাডাররা। তিনি অবশ্য কোনো মামলা জামিন পেতে কুষ্টিয়ায় যাননি, সাংবাদিক নির্যাতন বিরোধী একটি সমাবেশ যোগ দিতে যান।সমাবেশস্থল কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে জড়ো হয়েছিলেন আশপাশের বিভিন্ন জেলার সাংবাদিক নেতারাও। সমাবেশ শুরুর একপর্যায়ে ছাত্রদল ও যুবদলের ক্যাডাররা হামলা চালায়।

অদূরের জেলা বিএনপি অফিসের ভেতর থেকে বের হয়ে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে সমাবেশ স্থলে এসে মারধর-ভাঙচুর শুরু করেছিলো। হামলায় কপাল ফেটে রক্ত ঝড়েছিলো সাংবাদিক নেতা ও অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরীর।

উপরের দুটি ঘটনা মূলত একই সূত্রে গাথা। সেদিন হামলার মূল হোতা ছিলো কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি দলীয় সাংসদ এবং বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীরা আর আজ অভিযোগ কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের উপর।

সে সময় মাহমুদুর রহমান ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা। আর ২০০৬ সালে যে রক্তাক্ত হয়েছিলো সেই ইকবাল সোবহান চৌধুরী এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা।

দুটি ঘটনার কোনটাকেই সমর্থন করা যায় না। দুটি ঘটনাই ন্যাক্কারজনক। কিন্তু আজ মনে প্রশ্ন জাগে, ২০০৬ সালে মাহমুদুর রহমানের বিবেক কি কেদেছিলো? আর আজ কি ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিবেক কাদছে? আমি জানি, আমার এই প্রশ্ন কর্তাদের কানে পৌছাবে না। আর তারা বিষয়টাকে তুচ্ছ বলে এর জবাবও কোনদিন দিবেন না। যদিও তারা কোন জবাব দিতে অভ্যস্তও না।

আমাদের দেশে আজ শিক্ষকরা বিভক্ত। সাদা প্যানেল মার খায় নীল প্যানেলের কাছে আর নীল প্যানেল মার খায় সাদা প্যানেলের কাছে। উভয় প্যানেলই স্বস্ব দলের নেতাদের সামনে ল্যাজ নাড়ে। শিক্ষকতার মত মহান পেশার পেশাজীবীদের এমন কাজ দেখলে খুব কষ্ট হয়।

সাংবাদিকরা আজ অংশে অংশে বিভক্ত। এক অংশের নেতারা মার খায় অপর অংশের হাতে। এক অংশ মার খার আর অপর অংশ দুধের সর খায়। মামলা হামলা দিয়ে ক্ষমতাশীন অংশ ক্ষমতাহীন অংশকে দমিয়ে রাখে। পেশাদারিত্ব ভুলে সাংবাদিকতাকে নিয়ে গেছে দালালির সর্বোচ্চ শীখড়ে। সংবাদ মাধ্যম ও তার কর্মিরা এখন রাজনীতির হাতিয়ার। সংবাদ এখন শিল্প নয় ব্যবসায় পড়িনত হয়েছে আর সাংবাদিকরা হয়েছে ভাড়ুয়া। খুবই দুঃখজনক এটা।

চিকিৎসকরা দু’ভাগে বিভক্ত। এক অংশ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হলে অন্য অংশকে মনে করা হয় বিজাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী তাই ওদের নিপিড়ন কর, ওদের নিপিড়ন করা জায়েজ। ক্ষমতাশীন গ্রুপের হলে কাঙ্খীত ওএসডি, ঢাকাসহ ভালো জায়গায় পদায়ন আর ক্ষমতাহারাদের জন্য দূর্গম স্থানে পোষ্টিং।

ধর্মীয় নেতারা পর্যন্ত বিভক্ত হয়ে গেছে। তারাও লেজুর নাড়ে ধর্মের লেবাস ধরে। কে কার চেয়ে বেশি ভালো পা’চাটতে পারবে তার প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। দল বুঝে ফতোয়া দেয়। সুযোগ সুবিধা পেলে ফতোয়া ফেলে ক্ষমতার দিকে ঢলে।

আর রাজনীতিবীদরাতো অনেক আগেই বিভক্ত হয়ে আছে। ক্ষমতায় থাকলে টিনের চশমা পড়ে থাকে। বিরোধী গ্রুপের নেতাদের রাস্তায় ফেলে পিটায়, বস্ত্র হরণ করে, অপহরণ করে, মামলা হামলা দেয়। আবার দীর্ঘ নির্যাতনের স্বীকার হয়ে ক্ষমতায় গেলে প্রতিশোধ নেয়, অপর গ্রুপকে হামলা করে, মামলা দেয়, রক্তাক্ত করে। যতটা পেয়েছিলো তার চেয়ে বহু গুন বাড়িয়ে ফেরত দেয়। ক্ষমতায় এলে ক্ষমতাহীনদের ধার দেনা শোধ দেয় বহু গুন মুনাফা বাড়িয়ে। এ যেন এক অশুভ প্রতিযোগিতা। শুধু প্রতিযোগীতা নেই মেধার, প্রতিযোগীতা নেই সেবার, প্রতিযোগীতা নেই কর্মের।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একটি বাসযোগ্য সমাজ গড়তে চাইলে এখনই সবার সহনশীল হতে হবে। হতে হবে দেশ প্রেমিক। হতে হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ২০০৬ সালের হামলার ঘটনার দৃষ্টান্ত মূলক বিচার হলে হয়তো আজকের ঘটনা ঘটতো না। আবার আজকের ঘটনার যদি দৃষ্টান্ত মূলক বিচার না করা হয় তবে সামনে এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে, সে জন্য অপেক্ষায় থাকুন সবাই।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com