সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:২৬ অপরাহ্ন

যুদ্ধাপরাধীর নামে ঢাবির গবেষণাগার!

যুদ্ধাপরাধীর নামে ঢাবির গবেষণাগার!

মহিউদ্দিন রাসেল, ঢাবি প্রতিনিধি

                                  নামফলক মুছে দিচ্ছেন ঢাবি ছাত্রলীগের নেতা সোহান খান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মীর ফখরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি গণহত্যাকে সমর্থন ও তাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি যুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে জানা যায়। অথচ মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বিতর্কিত এ ব্যক্তির নামে ঢাবিতে একটি গবেষণাগার রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাবি ছাত্রলীগের নেতারা। মঙ্গলবার (১৭ জুলাই) দুপুরে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ওই বিভাগের গবেষণাগারের নামটি আলকাতরা দিয়ে ঢেকে দিয়ে সেখানে ‘১৯৭১’ লিখে দেন। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতারা চলে যাওয়ার পর বিভাগের উদ্যোগে আলকাতরা পরিষ্কার করে ফলকটিকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়েও বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়।

নামফলক মোছার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সদ্যবিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি সোহান খান বিবার্তাকে বলেন, আমরা কিছু ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারলাম মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারের নামটি এখন পর্যন্ত রাজাকার অধ্যাপক ফখরুজ্জামানের নামেই রয়েছে। বিষয়টি আমরা মানতে পারছিলাম না। অবাক হলাম, যখন দেখলাম কথাটা সত্যি।

সোহান বলেন, এ অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পেছনে অন্যতম ইন্ধনদাতা ছিলেন। অথচ তার নামে স্বাধীনতার এতো বছর পরেও গবেষণাগার! এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

ফলক মোছার ব্যাপারে আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে সোহান বলেন, আমরা অনুমতি নিইনি। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই কাজটা করেছি। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

বিভাগ কর্তৃক আলকাতরা মুছে ফেলার বিষয়ে সোহান বলেন, এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক কাজ। কোনো পরাজিত শক্তির কলঙ্কিত ইতিহাস এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটিতে থাকতে পারে না।

 

বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার সাথে কলা বলছেন ছাত্রলীগ নেতা সোহান খান

                      বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার সাথে কলা বলছেন ছাত্রলীগ নেতা সোহান খান

ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশিক মোহাম্মদ শিমুল এ বিষয়ে বিবার্তাকে বলেন, তারা (ছাত্রলীগ) যখন এ কাজ করছিল, আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা কেন এমনটি করছে? তখন তারা বললো, যুদ্ধাপরাধী কারো নামে কোনো ফলক ঢাবিতে থাকতে পারে না, তাই মুছে দিচ্ছি। আমি তাদের আবারো জিজ্ঞেস করলাম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তোমাদের এ দায়িত্ব দিয়েছে কিনা? তখন তারা ‘না’ বলল। তখন আমি তাদের বাধা দিয়ে বলেছিলাম, তোমরা এ কাজ করতে পারো না। কেননা, এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতারা আমার কথা শোনেননি।

মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক অধ্যাপক ড. মীর ফখরুজ্জামান রাজাকার ছিলেন কিনা – প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে এ শিক্ষক বলেন, শান্তি কমিটিতে স্যারের নাম ছিল। তবে যুদ্ধের পরে স্যারকে আবার চাকরিতে বহাল করা হয়েছিল। উনি যদি অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উনার নামের স্মৃতিফলক না রাখলে সেটা প্রশাসনের ব্যাপার। কিন্তু ছাত্রলীগ এ কাজ করবে কেন?

বিভাগ কর্তৃক আলকাতরা মুছে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, সহকারী প্রক্টর সোহেলের সাথে যোগাযোগ করে এটা করা হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানকে তাঁর বিভাগে গিয়ে পাওয়া যায়নি। এছাড়া তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও বন্ধ পাওয়া গেছে।

ঘটনার বিষয়ে জানালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মীর ফখরুজ্জামান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নায়ক জেনারেল রাও ফরমান আলীর মেয়ে তার বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেই সূত্রে রাও ফরমান আলীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি তার মুখ্য সহচর হিসেবে কাজ করেন।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২৫ মার্চ কালোরাতের পাকিস্তানী হত্যাযজ্ঞে ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব নিহত হওয়ার পর ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট হওয়া সত্ত্বেও একই সঙ্গে তাকে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট করা হয়। তিনি জগন্নাথ হলের নাম পরিবর্তন করে এর মুসলিম নামকরণের প্রস্তাব করেছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর প্রবেশের খবরে আনন্দিত হয়ে তিনি গরু জবাই করে কাঙালিভোজের আয়োজন করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, হানাদার বাহিনীর ক্রীড়নক ডা. আবদুল মুত্তালিব মালিকের প্রতিরক্ষা তহবিলে অর্থ সংগ্রহের জন্য শিক্ষকদের কাছে বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায়ের ব্যাপারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

সূত্র আরো জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশপন্থী শিক্ষক এবং ফজলুল হক হলের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের নামের তালিকা তিনি জেনারেল রাও ফরমান আলীর কাছে সরবরাহ করেছিলেন বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অভিযোগ ছিল। মনোবিজ্ঞান বিভাগের বাংলাদেশমনা যেসব শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্তে তিনি তাদের টেলিগ্রাম করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এর পর এসব শিক্ষকের বাড়িতে আল-বদর বাহিনী হানা দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে অন্যত্র পালিয়ে যান বলে তারা প্রাণে বেঁচে যান। (সূত্র : দৈনিক আজাদ- ২৯ জানুয়ারি ১৯৭২)।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com