শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন

জামিন পেলে আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে খুনের আসামি আলমাছ

জামিন পেলে আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে খুনের আসামি আলমাছ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আত্মগোপনে থেকেই এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ আলমাছ। ছাত্রলীগ নেতা হাসান মাহমুদ রুবেল হত্যা মামলার প্রধান আসামি চিহ্নিত সন্ত্রাসী, বহু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী বলে অভিযুক্ত আলমাছ এবার আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরছেন এমন খবরও পৌঁছে দিয়েছেন রূপগঞ্জে। এ খবরে রীতিমতো ঘুম হারাম হয়ে গেছে আলমাসের দ্বারা নির্যাতিত নিরীহ মানুষের।

জীবননাশের আশঙ্কায় ভুক্তভোগীদের অনেকে এরই মধ্যে এলাকা ছেড়েছেন। একের পর এক প্রাণনাশের হুমকিতে এরই মধ্যে রুবেল হত্যা মামলার বাদী মোমেন মিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এলাকাবাসী বলছে, জামিন পেলে আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে খুনের মামলার আসামি আলমাছ।

মাদক কারবারে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত ২৭ মে রাতে রূপগঞ্জের নিজ বাড়িতে নির্মমভাবে খুন হন মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক মেধাবী ছাত্রনেতা রুবেল। ওই মামলার প্রধান আসামি আলমাছ।

এরপর থেকেই আত্মগোপনে তিনি। এ মামলায় জামিনের জন্য বিচারকের নাম করে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও মাদক কারবারিদের কাছ থেকে তার স্ত্রী মমতাজ বেগম চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, সিনেমার ডনদের মতোই আলমাছ ওরফে কাইল্লা আলমাছের পোশাক-আশাক ও চলন-বলন। নির্যাতনের স্টাইলও একই ধরনের।

চলাফেরা করেন চারজন অস্ত্রধারী বডিগার্ড নিয়ে। রয়েছে হাজারো কূটবুদ্ধি। উপজেলার মাছিমপুর এলাকার নসুর উল্লাহ মুন্সীর ছেলে তোফায়েল আহমেদ আলমাছ ওরফে কাইল্লা আলমাছ খুন করেছেন এক ডজনের অধিক। থানা পুলিশের তালিকাতেও আলমাছ রূপগঞ্জ উপজেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী।

সব সময়ই তিনি সরকারি দলের সমর্থক। শিল্পপতি রাসেল ভুইয়া হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হয়। তবে উচ্চ আদালতে আপিল করে মামলায় খালাস পেয়ে কিছু সময়ের জন্য আড়ালে চলে যান। হত্যা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, জমি দখল, মানুষের জমি দখল করে মাছের খামার তৈরিসহ অজস্র অভিযোগ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, কাইল্লা আলমাছ রূপগঞ্জে বিভীষিকাময় এক আতঙ্কের নাম। আলমাছ ও তার বাহিনীর কাছে জিম্মি উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নসহ বহু এলাকার সাধারণ মানুষ। মুড়াপাড়ায় তার নামে পরিচালিত বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো এলাকায়।

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারা হয়েছেন আরও বেপরোয়া। মুড়াপাড়া অঞ্চলে শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মানুষের জমি দখল, জমি দখল করে নিজের নামে মাছের খামার তৈরি, কৃষিজমির মাটি ইটভাটায় বিক্রিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা কাইল্লা আলমাছ ও তার বাহিনীর লোকেরা করছেন না।

যেভাবে উত্থান : প্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান জামাল হাজির ছেলে মুড়াপাড়া কলেজের সাবেক ভিপি খালেদ বিন জামালের হাত ধরে নব্বইয়ের দশকে আলমাছের উত্থান ঘটে। খালেদ বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালেই আলমাছ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ, লোক ঠ্যাংঙ্গানোসহ নানা অপকর্মে যুক্ত হন।

সন্ত্রাসী হামলায় ১৯৯১ সালে খালেদ নিহত হলে সব কিছু চলে যায় আলমাছের দখলে। এরই একপর্যায়ে ২০০০ সালে দিনদুপুরে রাসেল পার্কের ভিতরে আলমাছ ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে হত্যা করে বিএনপি নেতা ও শিল্পপতি রাসেল ভুইয়াকে। সেই মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হলে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। পরে মামলায় খালাস পেয়ে কিছুটা আড়ালে চলে যান।

২০০৪ সাল থেকে শুরু করেন বিভিন্ন মিল-কারখানার মালিকদের জমিজমা জবরদখলে সহযোগিতা। চুক্তির ভিত্তিতে তিনি জমির দখল বুঝিয়ে দিতেন। এই সময়ে তিনি বিভিন্ন হাউজিংয়ের ভাড়াটে ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেন। এ ছাড়া বিভিন্নজনকে হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতে থাকেন। পাশাপাশি অস্ত্রের ব্যবসা শুরু করে গড়ে তোলেন অস্ত্রধারী বাহিনী।

গত পৌর নির্বাচনের আগে নিজের স্ত্রীকে প্রার্থী করাকে কেন্দ্র করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভুইয়ার সঙ্গে এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জের ধরে বিএনপির সমর্থক হয়েও আলমাছ এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর কাছাকাছি পৌঁছেন এবং মুড়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায় করেন।

চেয়ারম্যান হিসেবে জয়লাভ করতে রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৩ হাজার অস্ত্রধারী ক্যাডার ভাড়া করা হয়েছিল। সে নির্বাচনে মুড়াপাড়ার ১০ শতাংশ ভোটারও তাদের ভোট দিতে পারেনি। সে সময় নিজ দলের সমর্থক জাহাঙ্গীরকে হত্যা করে কৌশলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিপক্ষ চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল জাব্বারসহ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করান।

এর পরপরই মুড়াপাড়া বাজারে নতুন দোকান বরাদ্দের নামে লুটে নেন ৩ কোটি টাকা। ওয়াটা ক্যামিক্যালের বালু ভরাটকে কেন্দ্র করে হত্যা করান মুড়াপাড়া সৈনিকলীগের সভাপতি তারা মিয়াকে। প্রাণ আরএফএল, প্রভিটা, ওয়াটা ক্যামিক্যাল, সীম ফেব্রিক্স, লিনা পেপার, এসিআই সল্ট, নিসু কুটি টিস্যু পেপার, দড়িকান্দি ডগইয়ার্ডসহ শিল্পকারখানায় শুরু করেন বেপরোয়া চাঁদাবাজি।

এ ছাড়া মুড়াপাড়া ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জমি জবরদখল, ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রিসহ নানা উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করেছেন কাইল্লা আলমাছ। স্থানীয়রা আরও জানায়, বর্তমানে আলমাছ বাহিনী রূপগঞ্জের ভূঁইয়া পরিবারের মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়ার মালিকানাধীন মাছুমাবাদ এলাকার ৭০ বিঘা জমির একটি দীঘি দখলের চেষ্টা করছে।

এক হিন্দু লোককে দাতা বানিয়ে ভুয়া দলিল করে দীঘি দখলের চেষ্টায় রয়েছেন আলমাছ। হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জমি দখলে নিতে জোরপূর্বক বালু ভরাট করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। উপজেলার দড়িকান্দি এলাকায় মেসার্স আশমিনা ফেব্রিক্স নামে একটি টেক্সটাইল মিল স্থাপনের জন্য মোশাররফ হোসেন পাকা বিল্ডিং স্থাপন করলে সেখানে বালু ভরাট করে ফেলে আলমাছ বাহিনরী। ‘পৈতৃক সম্পত্তি হারিয়েও বর্তমানে প্রাণের শঙ্কায় রয়েছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক মোশাররফ ভূইয়া।

এ ছাড়া মুড়াপাড়ার নাসিংগল ও কর্নগোপ মৌজায় মাছিমপুর এলাকার কৃষক শাহ আলমের আড়াই বিঘা, সোনা মিয়ার আড়াই বিঘা, মোস্তফার ৪ বিঘা, খলিল মিয়ার ২ বিঘা, ছালেকের ২ বিঘা, গফুর মিয়ার সোয়া বিঘা, আসলামের ২ বিঘা, আয়নালের ৩ বিঘা, মাহমুদের সোয়া ২ বিঘা, আবু তাহেরের ১ বিঘা, মনির উদ্দির দেড় বিঘা, রিয়াজউদ্দির ১ বিঘা, ছহুল উদ্দিনের ১ বিঘা, খুরছু মিয়ার ১ বিঘা, স্বপন চৌধুরীর ১ বিঘাসহ ৭০ কৃষকের প্রায় ২৫ একর কৃষী জমি দখল করে অস্ত্রধারী চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ আলমাছ মাছ চাষ করছে বলে অভিযোগ করেছে জমির মালিক কৃষকরা।

মাছ চাষের জন্য মত্স্য খামার করার কারণে ইরি-বোরো ফসলি জমি ডুবে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া গত দুই বছর ধরে তারা জমিতে চাষাবাদ তো দূরের কথা পা ফেলতেও পারেননি। জমির মালিকদের কোনো টাকা-পয়সা না দিয়ে জবরদখল করা ভূমিতে ঝুলছে চেয়ারম্যানের সাইনবোর্ড।

এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্তরা স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করায় জমি মালিকদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে চেয়ারম্যান। রূপগঞ্জ থানার একটি সূত্র থেকে জানা যায় ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর কাইল্লা আলমাছ ছিলেন থানার শীর্ষ টেরর তালিকায়।

এরপর থেকে টাকা পয়সা আসতে থাকলে আস্তে আস্তে কালো সাদা হতে থাকে। এমপির মুরিদ হওয়ার পর তিনি পুরোদস্তুর ভালো মানুষ। নির্বাচিত হয়েছেন চেয়ারম্যান। কেউ তার বিরুদ্ধে লিখতে গেলেই মামলা ঠুকে দেন। তার দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলায় ইত্তেফাকের সাংবাদিক এমএ মোমেন এবং সাংবাদিক হানিফ মোল্লা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এখন হত্যাও করান করপোরেট কায়দায়। ২০০৪ সালে বানিয়াদি এলাকার শমসের, ২০০৮ সালে মীরকুঠিরছ এলাকার নয়ন, ২০১২ সালে ছাত্রদল নেতা নজরুল ইসলাম বাবু, ২০১৩ সালে তার পিতা জালাল ও একই বছর যুবলীগ নেতা শওকতকে খুনের পেছনে রয়েছে আলমাছ ও তার বাহিনীর নাম। বর্তমানে সে যে এলাকায় চলাচল করে সে এলাকার মানুষ নিশ্চুপ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। চলাফেরা করেন চারজন অস্ত্রধারী বডিগার্ড নিয়ে। রূপগঞ্জের মূর্তিমান আতঙ্কের নাম কাইল্লা আলমাছ।

এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ আলমাছ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।’ আমার উত্থান ঠেকাতে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। রূপগঞ্জ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘চেয়ারম্যান আলমাছের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com