শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:১৮ অপরাহ্ন

তদন্তে গাফিলতিতে ছয় বছরের শিশু মাদক মামলার আসামি

তদন্তে গাফিলতিতে ছয় বছরের শিশু মাদক মামলার আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক||তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতিতে পাঁচ বছর আট মাসের শিশু (বর্তমানে আট বছর) খাইরুল আমিনকে করা হয়েছে মাদক মামলার আসামি। পুলিশের হাতে ধরা পড়া সরোয়ার আলম নামের এক মাদক কারবারি তার নাম গোপন করে পুলিশকে বলে আপন চাচাতো ভাই শিশু খাইরুল আমিনসহ তার বাবার নাম।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই

না করেই অভিযোগপত্র পাঠিয়ে দেন আদালতে। এরই মধ্যে মূল আসামি সরোয়ার আলম জামিনে বেরিয়ে যায় জেল থেকে। তার স্থলে অভিযোগপত্রে নাম আসে আপন চাচাতো ভাই শিশু খাইরুলের। মাদরাসায় পড়ুয়া শিশু খাইরুলই বর্তমানে মাদকের মামলার আসামি হয়ে হাজিরা দিচ্ছে আদালতে। খাইরুলের বাবা শামশুল আলমের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা পলাতক আসামি সরোয়ারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তাঁর শিশুপুত্রকে আসামি বানিয়েছে।

এদিকে ওই তদন্ত কর্মকর্তা মহেশখালী থানার উপপরিদর্শক বিকাশ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে আদালত নির্দেশ দিলেও তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। আদালতের এমন নির্দেশনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না কক্সবাজারের পুলিশ সুপার।

২০১৪ সালের ৯ আগস্ট রাতে

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম খোন্দকারপাড়া জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় মহেশখালী থানা পুলিশ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৮০ লিটার চোলাই মদ। আটক করা হয় ছয় মাদক কারবারিকে।

আটক ওই ছয় মাদক কারবারির সঙ্গে শিশু খাইরুল আমিন না থাকলেও মাদকের মামলায় শিশুটির নাম আসামি হিসেবে রেকর্ড করা হয়। পরে মামলার অভিযোগপত্রেও যুক্ত করা হয় শিশুটির নাম। তারপর গত চার বছর শিশুটি থানা আদালতে হাজিরা দিচ্ছে মাদক মামলার আসামি হিসেবে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কৃষক পিতা শামশুল আলমের হাত ধরে মহেশখালী থেকে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিতে আসে কিশোর খাইরুল আমিন।

মহেশখালী থানার উপপরিদর্শক আবু জাফর ৮০ লিটার চোলাই মদসহ ছয় কারবারিকে আটকের পর নিজেই বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় মামলাটি (জিআর-২৪৮/১৪) দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হচ্ছে আকতার কামাল (২৯), সিএনজিচালক মাহবুব আলম (৩২), খাইরুল আমিন (২০), নুরুল আবছার (১৯), আবদুর করিম (২০) ও রেজাউল করিম (২০)। তারা সবাই মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী ও বড় মহেশখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা।

বর্তমানে মামলাটির অধিকতর তদন্ত চলছে। মহেশখালী থানা পুলিশ ওই মামলার এক মাসের মধ্যেই চার্জশিট দেয়। মামলাটি বিচারের জন্য কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর পর পলাতক আসামি হিসেবে শিশু খাইরুল আমিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

গত বছর ২৪ এপ্রিল মহেশখালী থানা পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে খাইরুলকে গ্রেফতার করতে গিয়ে অবাক হয়। কারণ খাইরুলের বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সে শিশু। ফলে একই দিন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পায় খাইরুল। কিন্তু এর পর থেকে তাকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে আদালতে।

কক্সবাজারের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক নাজমুল হক বলেন, ‘মাদরাসায় পড়ুয়া শিশু খাইরুলকে দেখে আদালতের বিচারক বিব্রত হন। এ কারণে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। পিবিআই মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে ইতিমধ্যে মহেশখালী দ্বীপের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, খাইরুলের জেঠাতো ভাই সরোয়ার আলম (২০) চোলাই মদসহ পুলিশের হাতে আটকের পর নিজের নাম গোপন করে আপন চাচাতো ভাই শিশু খায়রুলের নাম রেকর্ড করায়।’

এর মধ্যে মূল আসামি সরোয়ার আলম জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে যায়। কোনো তদন্ত ছাড়াই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক বিকাশ চক্রবর্তী আসামি সরোয়ার আলমের পরিবর্তে অভিযোগপত্রে শিশু খাইরুলের নাম লিপিবদ্ধ করেন। গত ৫ মার্চ মামলার বিচারিক আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ মীর শফিকুল আলম মামলা তদন্তে এ রকম গাফিলতির জন্য তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন পিবিআইকে।

শিশু খাইরুলের পিতা শামশুল আলম বলেন, ‘যখন মামলাটি দায়ের করা হয় আমি তখন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলাম। আমারই বড় ভাই মোহাম্মদ আলমের পুত্র সরোয়ার আলম মদসহ ধরা পড়ার পর নিজের নাম গোপন করে আমার পুত্র খাইরুলের নাম বলে। তদন্ত কর্মকর্তা আমার ভাতিজার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে এ রকম ঘটনা ঘটিয়েছে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপুলিশ পরিদর্শক বিকাশ চক্রবর্তী বর্তমানে নোয়াখালীর কবিরহাট থানায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে জানা গেছে। কক্সবাজার রিজার্ভ পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (আরও) উপপরিদর্শক বাপ্পী সূত্রধর এই তথ্য জানিয়েছেন। বিকাশ চক্রবর্তীর মোবাইলে গতকাল বিকেলে কয়েকবার ফোন করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মহেশখালী থানার সেই মামলাটির ব্যাপারে তিনি অবহিত নন। এমনকি আদালতের এ রকম নির্দেশনা সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com