মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন

নির্বাচন থেকে পিছু হটছে না বিএনপি

নির্বাচন থেকে পিছু হটছে না বিএনপি

একই সঙ্গে চলছে আন্দোলন ও নির্বাচনী প্রস্তুতি
অপেক্ষা করবে সমঝোতার জন্য
প্রতিহত করা হবে একতরফা নির্বাচন
:: রেজাউল করিম ভূঁইয়া ::

বিএনপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা নিয়ে কারাগারে যাওয়ার বিষয়টিকেও তারা সরকারের এক তরফা নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে মনে করেন। তবে কৌশল যাই হোক একাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে এখনই পিছু হটছে না বিএনপি।

নির্বাচনে জনগণের রায়ের মাধ্যমে জয়ী হয়ে সরকারের সব ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ডের জবাব দিতে চায় দলটি। আর তাই বর্তমানে দলটির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করার পাশাপাশি ন্যূনতম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের আবহ তৈরিতে সরকারকে বাধ্য করা। আর তা না হলে দলটি কঠোর আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে। দলটির নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন অবস্থানের কথাই জানা গেছে।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পথেই থাকবে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। সে লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাচনের বছরে সুনির্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। বিভিন্ন সূত্র থেকে বিএনপির কাছে এমন খবর আছে যে সরকার কোনোক্রমেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে দেবে না। কিন্তু খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচনের পক্ষে ইতিবাচক বক্তব্য রাখছেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২ জানুয়ারি ছাত্রদলের এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, চাইলেই বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না।

আর বিএনপিকে ছাড়া এ দেশে কোনো নির্বাচনও হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল এবং আমরা নির্বাচন করবই। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কারাগারে যাওয়ার আগেও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় ছয়টি শর্ত সামনে রেখে ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে’ করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন বেগম খালেদা জিয়া।

শর্তগুলো হলো: ১. জাতীয় নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে, ২. জনগণ যাতে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারে সেই রকম পরিবেশ তৈরি করতে হবে, ৩. নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, ৩. নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে; ৪. ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে, ৫. নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে হবে নিরপেক্ষতার সঙ্গে ও ৬. কোনো ‘ইভিএম-টিভিএম’ চলবে না। এছাড়া নির্বাহী কমিটির সভায় খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে’ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়ার এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান।

সূূত্রে জানা গেছে, বিএনপি মনে করে, ন্যূনতম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তারাই ক্ষমতায় যাবে। কারণ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়াকে রাজনৈতিক মামলায় ৫ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে আটকে রাখায় সরকারি দল তথা জোটের তুলনায় এই মুহূর্তে তাদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। সে কারণেই সরকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে ভয় পায় বলে মূল্যায়ন বিএনপির। ফলে সরকার যত নেতিবাচক অবস্থানই নিক না কেন, নির্বাচনের মধ্যে ঢুকে পড়তে চায় বিএনপি।

দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ সকল নেতারা তাদের বেশির ভাগ বক্তৃতায়ও বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবে এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। তাই গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর ‘ধৈর্য ও সহনশীলতার’ রাজনীতির নতুন কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপি।

দলটি মনে করছে, বেগম জিয়া ও বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতেই সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কঠোর আন্দোলন কর্মসূচিতে বিএনপিকে ব্যস্ত রেখে ‘সব শক্তি’ এখনই ক্ষয় করতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

কিন্তু বিএনপি সরকারের ফাঁদে পা দেবে না। দলটির শুভাকাক্সক্ষী তথা সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যেও এখন আলোচনা দ্রুত গতিতে খালেদা জিয়ার মামলার রায় প্রকাশ, নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়সহ সরকারের তরফ থেকে এখন যা কিছু করা হচ্ছে, সবই বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা তথা আরেকটি একতরফা নির্বাচনের জন্য। কিন্তু বিএনপি তাদের সেই সুযোগ দিবে না।

শত প্রতিকূলতার মধ্যেও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চায় দলটি। আর বেগম জিয়াকে সঙ্গে নিয়েই তাদের নির্বাচনে যাওয়ার টার্গেট। সেই লক্ষ্যে বিএনপি- দলীয়প্রধানের নির্দেশনায় আপাতত কোনো ‘কঠোর’ কর্মসূচিতে যাচ্ছে না। বরং, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সরকারের ধরপাকড় পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে নেতাকর্মীরা।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, যেকোনও মূল্যে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে দলটি।

দলের কেন্দ্রীয় নেতারা একাধিকবার অভিযোগ করে বলেছেন, নির্বাচনে যেন বিএনপি অংশ না নেয় এ কারণেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার ব্যবস্থা করেছে সরকার। দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে জেল দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এর মাশুল গুনতে হবে।

এই নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকারকে জবাব দেবে বিএনপি। দলটির এ ধরনের অবস্থান নেওয়ার কারণ একদিকে বিএনপিকে এখন ব্যাপক জনপ্রিয় একটি দল বলে মনে করা হয়। দ্বিতীয়ত, এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে ফলাফল অনুকূলে যেত বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে।

বিএনপির বড় একটি অংশও এমনটিই মনে করে, যারা ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছিল। ফলে সব কিছু মিলিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে পরিস্থিতি অনুকূলে যাবে এবং প্রশাসনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়বে এমন ভাবনা নিয়েই কর্মকৌশল ঠিক করছে দলটি বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ‘নির্বাচনে যাওয়ার পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে এ কথা আমরা এখনো পুরোপুরি বলতে রাজি নই। আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। কিন্তু দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে আমরা যাব না।

তিনি আরও বলেন, সরকারের জনপ্রিয়তা শূন্যেও কোঠায় চলে যাওয়ায় বিগত ৫ জানুয়ারির মতোই সরকার একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটছে। সে লক্ষ্যেই খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি ও তার দলকে আগামী সংসদ নির্বাচন থেকে দূরে রেখে আরেকটি একতরফা নির্বাচন করা যায়। কিন্তু এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের একতরফা উদ্যোগ অবশ্যই প্রতিহত করা হবে। আর সরকার বাধা না দিলে চেয়ারপারসন প্রচলিত আইনেই বেরিয়ে আসবেন। তখন ম্যাডামকে সঙ্গে নিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে যাবে বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহম বলেন, আগামী নির্বাচনে যাওয়ার কথা কয়েক বছর ধরেই আমরা বলে আসছি। বিএনপির এমন প্রস্তুতিও রয়েছে। কিন্তু চেয়ারপারসনের মামলার রায়কে সামনে নিয়ে আসার পাশাপাশি সরকার বর্তমানে যা করছে তাতে স্পষ্ট যে তারা বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। ইচ্ছাকৃতভাবে তারা আমাদের নির্বাচনের বাইরে তথা আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিতে চায়।

শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে কঠোর আন্দোলন ছাড়া বিকল্প কিছুই থাকবে না আমাদের সামনে। তবে তার আগে সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com