মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

আমতলীতে অবৈধ ইটভাটার পরিবেশ দূষণে,বিপাকে এলাকাবাসী|সময় ট্রিবিউন

আমতলীতে অবৈধ ইটভাটার পরিবেশ দূষণে,বিপাকে এলাকাবাসী|সময় ট্রিবিউন

মেহেদী হাসান ষ্টাফ রিপোর্টারঃ অবৈধ ইটভাটা চারদিকে চারটি বিদ্যালয়। মাঝখানে শতশত একর ফসলি মাঠ। ফাঁকে ফাঁকে জনবসতি। বরগুনার আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম। নাম পূর্ব চিলা। একটিমাত্র ইটভাটার দাপটে চরম ঝুঁকিতে এখন এ গ্রামের শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১০ হাজার গ্রামবাসী।

পূর্ব চিলা গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এখন স্কুলে ক্লাশ করে নাকে রুমাল চেপে। এ গ্রামের বাতাসে ভাসে ইটের ভাটার কয়লা পোড়া বিষাক্ত গন্ধ। পরিবেশ আইন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনবসতিপূর্ণ পূর্বচিলা গ্রামের রহমানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে এ ইটভাটাটি তৈরী করেছেন হলদিয়া ইউনিয়নের খোদ ইউপি চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম মৃধা নিজেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালের দিকে স্থানীয় ঘুঘুমারির খাল দখল করে “সারা” ব্রিকফিল্ড নামে একটি ইটভাটার কার্যক্রম শুরু করেন আমতলী উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম মৃধা। ঘুঘুমারির খাল ও খালের দু’পারের খাসজমিসহ ফসলী জমি দখল করে এখন যে ইটভাটাটির আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় বারো একর।

রহস্যজনকভাবে এ ইটভাটার অনুকুলে ছাড়পত্রও দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।ভাটা থেকে মাত্র তিন’শ গজ দক্ষিণে অবস্থিত পূর্ব চিলা রহমানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রায় চার শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। ইটভাটাটির চারদিকে এক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ছোনাউটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্বচিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চরচিলা প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে আরও তিনটি বিদ্যালয়। পূর্বচিলা রহমানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, কয়লা ও কাঠপোড়ানোর বিষাক্ত ধোঁয়ার দুর্গন্ধে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

মাটিকাটা এস্কাভেটর, ট্রাক, ট্রাক্টর ও সেচমেশিনের ভয়াবহ শব্দদূষণে ক্লাসে পাঠদান করানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্বচিলা রহমানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী জানায়, ‘স্কুলে আসতেও গন্ধ, যেতেও গন্ধ এমনকি স্কুলের মধ্যে যতটুকু সময় আমরা থাকি ততটুকু সময়ও আমাদের বিকট গন্ধ নাকে নিয়েই ক্লাশ করতে হয়।’ ষষ্ঠ শ্রেণির অপর একজন শিক্ষার্থী জানায়, ‘অনেকদিন ধরে এমন গন্ধ এখন অনেকেরই সয়ে গেছে, তবে কিছু কিছু শিক্ষার্থী এ গন্ধ সইতেই পারে না। তাদের মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব হয়। মাথা ব্যাথাও থাকে।’

একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুজন হোসেনের পিতা দুলাল চৌকিদার (৫০) বলেন, কয়লাপোড়া বিকট গন্ধে দীর্ঘসময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করে অনেক শিক্ষার্থীই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, কোনরূপ অনুমতি ছাড়াই পাশর্বর্তী নদীর তীর থেকে ব্রিকফিল্ডের জন্য এস্কাভেটর দিয়ে কেটে নেয়া হচ্ছে সরকারি জমির মাটি। এতে ধ্বংস হচ্ছে সংরক্ষিত বনভুমিও। আর টাফিগাড়িতে মাটি পরিবহনকালে কাদা-মাটি পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে পিচঢালা স্থানীয় সড়ক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্ব চিলা গ্রামের একাধিক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, মাত্র দশ বছর আগে এই ইটভাটার মধ্য দিয়ে ঘুঘুমারির খাল নামে একটি খরশ্রোতখাল প্রবহমান ছিল। আক্ষেপ করে স্থানীয় এলাকাবাসী মহসীন মৃধা (৫০) বলেন,“ঘুঘুমারির খালের পানিতে একসময় কত মাছ ধরছি, এই পানি হিচ্চা কত ধান, কত রবিশষ্য লাগাইছি। আর আইজ কেউ বুজতেই পারবে না একসময় এইহানে একটা খাল আছিল।

এ্যাহন পানি লাগলে পানি পাই না, আবার বর্ষার সিজনে পানিতে ডুইব্বা মরি”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বনভূমি, অভয়ারণ্য, জনবসতিপূর্ণ ও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা কঠোরভাবে নিষেধ থাকলেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাত্র তিন বছরের মধ্যে গড়ে তোলা হয় এই বিশাল ইটভাটাটি।

এ বিষয়ে সারা ব্রিক্স এর ম্যানেজার হাফিজুর রহমান সেলিমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ইটভাটার কারণে কোন সমস্যা হচ্ছে না। এ বিষয়ে সারা ব্রিক্স-এর মালিক, ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা মো.শহিদুল ইসলাম মৃধা বলেন, তার ব্রিক ফিল্ডের অনুকুলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচনী বিরোধের জের ধরে তার স্বজনরাই তার এ ইটভাটার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল-এর সহকারী পরিচালক আরেফিন বাদল জানান, সারা ব্রিক্স-এর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকলেও তার নবায়ন নেই। তাছাড়া ওই ব্রিক ফিল্ডের তিন’শ গজের মধ্যে একটি স্কুল থাকায় পরিবেশ অধিপ্তর থেকে ইটভাটাটি অপসারণের জন্যে নোটিশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. মোখলেছুর রহমান জানান, অবৈধ ইটভাটা অপসারনে তারা সচেষ্ট রয়েছেন। খুব শিঘ্রই ম্যজিস্ট্রেট পাঠিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

China Scholarship bd

Somoy-Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis. © All rights reserved  2018 somoytribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com